দেশভাগ,সিলেট গণভোট এবং করিমগঞ্জ

পান্নালাল রায়

December 29, 2025

স্বাধীনতা ও দেশভাগের সময় সবচেয়ে বিতর্কিত অঞ্চল ছিল করিমগঞ্জ।১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ভারত জুড়ে পত পত করে দেশের জাতীয় পতাকা উড়লেও করিমগঞ্জ ছিল এর ব্যতিক্রম। করিমগঞ্জে জাতীয় পতাকা উত্তোলন হয় ১৭ আগষ্ট। আর আনুষ্ঠানিক ভাবে এখানে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি রূপায়িত হয় ২৬ আগষ্ট।কিন্তু কেন এমনটা ঘটেছিল? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের চোখ বোলাতে হবে ইতিহাসের ধূসর পৃষ্ঠায়।এই প্রসঙ্গে বাণীব্রত রায় তাঁর সুবৃহৎ গ্রন্হ 'করিমগঞ্জ কথা'য় তুলে ধরেছেন বিস্তৃত তথ্য।বলেছেন সিলেট নিয়ে বিতর্কিত গণভোট,রেডক্লিফ কমিশনের সীমানা নির্ধারণ এবং করিমগঞ্জ বিভাজনের কথা।

স্বাধীনতার পূর্ববর্তী দিনগুলোতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি,দেশভাগ,সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদি ঘটনা প্রবাহের কথা বলে গ্ৰন্হকার সেদিনের করিমগঞ্জ তথা সিলেটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের শ্বেতপত্রে ভারত বিভাজনের মধ্য দিয়ে খণ্ডিত স্বাধীনতার কথা ঘোষিত হয়।আর তাতেই বলা হয় গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে সিলেট জেলার ভাগ্য।ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ প্রস্তাবিত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা তাও নির্ধারিত হবে গণভোটের মাধ্যমে।লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ঘোষণা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ মেনে নিলেও সিলেট জেলায় গণভোটের সিদ্ধান্তে সুরমা উপত্যকার নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং সিলেটের ভারতভুক্তির দাবি উঠে প্রবল ভাবে।কিন্তু সমস্ত দাবি উপেক্ষা করে মাউন্টব্যাটেনের ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই সিলেট জেলায় গণভোটের দিন ধার্য হয়।পক্ষে-বিপক্ষে শুরু হয় ব্যাপক প্রচার। এই গণভোটের পরিণতি সকলেরই জানা।সিলেট চলে যায় পাকিস্তানে।বাণীব্রতবাবু তাঁর গ্রন্হে বিস্তৃত ভাবে তথ্য সহকারে সেই গণভোটের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন,সিলেটের চা বাগান সমূহের দেড় লাখেরও বেশি হিন্দু শ্রমিককে সেদিন গণভোটে অংশ গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল শুধুমাত্র তারা ভূমিপুত্র নয় বলে।যদি চা শ্রমিকরা ভোটে অংশ নিতে পারতেন তবে গণভোটের ফলাফলই অন্য রকম হতো।গ্রন্হকার জানিয়েছেন সেদিনের গণভোটে সিলেটের পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে ভোট পড়েছিল ২,৩৯,৬১৯ এবং বিপক্ষে ১,৮৪,০৪১টি।যাইহোক, এই বিতর্কিত গণভোটের পর সিলেট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও সিলেটের করিমগঞ্জ নিয়ে কিন্তু ধোঁয়াশা কাটেনি।ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা আনুষ্ঠানিক ভাবে উদযাপিত হলেও রেডক্লিফ সীমানা কমিশনের রিপোর্ট তখনও প্রকাশিত হয়নি। ১৪ আগষ্ট করিমগঞ্জ সহ সমস্ত সিলেট জেলায় পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল।১৩ আগষ্ট দু'দেশের সীমানা চূড়ান্ত হলেও তা প্রকাশ করা হয়েছিল ১৭ আগষ্ট। ওয়াকিবহাল মহলের মতে স্বাধীনতা দিবসে বিভ্রান্তি এড়াতে এবং বাংলায় চলমান অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতেই এই বিলম্ব করা হয়েছিল।রেডক্লিফ কমিশনের রিপোর্টে তদানীন্তন করিমগঞ্জ মহকুমার ছয়টি থানার মধ্যে সাড়ে তিনটি থানা এলাকা(রাতাবাড়ি,পাথারকান্দি,বদরপুর ও করিমগঞ্জ থানার অর্দ্ধাংশ)ভারত ভুক্ত হয় এবং বাকি অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।সীমানা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর করিমগঞ্জে ভারতের পতাকা উত্তোলিত হয়।আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয় ২৬ আগষ্ট।

করিমগঞ্জ সম্পর্কে এমন সব নানা তথ্য,স্বাধীনতা আন্দোলনে করিমগঞ্জের ভূমিকা,স্বাধীনতা ও দেশভাগ,করিমগঞ্জের ব্যবচ্ছেদ ইত্যাদি সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে 'করিমগঞ্জ কথা' গ্রন্হটিতে।মহাত্মা গান্ধীর সুরমা উপত্যকা সফর,বদরপুর রেল স্টেশনে করিমগঞ্জবাসীর পক্ষে মহাত্মা গান্ধীকে সম্বর্ধনা,নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর করিমগঞ্জ সফর,করিমগঞ্জে মাস্টারদা সূর্য সেনের আত্মগোপন এমন সব উজ্জ্বল তথ্য সবিস্তারে সন্নিবিষ্ট হয়েছে আলোচ্য গ্রন্হটিতে।বর্ণিত হয়েছে করিমগঞ্জ রেল স্টেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন সহ এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথাও।ঊনপঞ্চাশটি অধ্যায়কে দশটি ভাগে ভাগ করে সমস্ত করিমগঞ্জের অতীত বর্তমানের প্রেক্ষিতে রচিত হয়েছে এই মূল্যবান গ্রন্হটি।বিভাগ সমূহে রয়েছে করিমগঞ্জের ভৌগোলিক বৃত্তান্ত,ইতিহাস-লোককাহিনি,পত্তন ও বিকাশ,স্বাধীনতা আন্দোলন ও দেশভাগ,শিক্ষা ও ক্রীড়া,সাহিত্য ও সাংবাদিকতা,শিল্প-সংস্কৃতি ইত্যাদি।এমনকি করিমগঞ্জের দ্রষ্টব্য স্হান সমূহের মধ্যে ঐতিহাসিক বদরপুর দুর্গ,সিপাহি বিদ্রোহের যুদ্ধ স্মারক মালেগড় সহ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাশয় শনবিলের বর্ণনাও রয়েছে গ্রন্হটিতে।ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলোকে অবিভক্ত করিমগঞ্জের আলোচনায় লেখক 'নিধনপুর তাম্রফলক','কালাপুর তাম্রফলক','ভাটেরা তাম্রফলক' সহ বিভিন্ন শিলালিপির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। এসেছে ইতিহাস গবেষক সুজিত চৌধুরীর আলোচনার কথাও। তাম্রশাসনের আলোকে করিমগঞ্জের আদি ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,দশম শতকে করিমগঞ্জ ছিল বঙ্গ-হরিকেলের রাজা শ্রীচন্দ্রের রাজ্যসীমার অন্তর্গত।গ্রন্হটিতে উল্লেখ করা হয়েছে সিলেটে মুসলমান আধিপত্য কায়েমে আরব দেশীয় দরবেশ শাহজালালের ভূমিকার কথাও।এতে বর্ণিত হয়েছে ঐতিহাসিক পর্ব থেকে করিমগঞ্জ মহকুমা এবং পরে জেলা গঠনের বিষয়।উল্লেখ্য,১৯৮৩ সালের ১ জুলাই করিমগঞ্জ মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়েছিল।গ্রন্হটিতে প্রাক উপনিবেশ সময়কাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সমস্ত বিবরণাদি সন্নিবিষ্ট হয়েছে।করিমগঞ্জ ও সংশ্লিষ্ট নানা জনপদকে কেন্দ্র করে এই সুদীর্ঘ সময়কালের সমস্ত ঘটনা প্রবাহ মুন্সিয়ানার সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে 'করিমগঞ্জ কথা'য়।২০২১ সালের পর আর কোনও বিষয় গ্রন্হটিতে স্হান না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বাদ পড়েছে 'শ্রীভূমি' নামকরণ প্রসঙ্গও। উল্লেখ করা যায় যে,সাম্প্রতিক কালে করিমগঞ্জের নাম হয়েছে শ্রীভূমি।

আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।বিভিন্ন অঞ্চলের উপর ইতিহাস ভিত্তিক নানা গ্রন্হও রচিত হচ্ছে।আসলে সমস্ত অঞ্চলের ইতিহাস নিয়েই তো দেশের সামগ্রিক ইতিহাস!তাই আঞ্চলিক ইতিহাস মোটেই উপেক্ষনীয় নয়।বাণীব্রত রায় যে পরম মমতায় তাঁর জন্মভূমির উপর সাড়ে পাঁচশ পৃষ্ঠার এই বৃহৎ কলেবরের গ্রন্হটি রচনা করেছেন তার প্রমাণ রয়েছে এতে সন্নিবিষ্ট অধ্যায় সমূহে। স্পষ্ট বোঝা যায় গ্রন্হ রচনায় তাঁর কঠোর পরিশ্রমের কথাও। করিমগঞ্জ তথা এই সমগ্র অঞ্চলের ইতিহাস রচনায় 'করিমগঞ্জ কথা' নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান আকর গ্রন্হ হিসেবেই বিবেচিত হবে।দেশভাগের সময় সিলেটের বিতর্কিত গণভোট,করিমগঞ্জের ব্যবচ্ছেদ ইত্যাদি যেমন নানা স্মৃতি উস্কে দেবে গ্রন্হটি,তেমনই কারও কারও মনের জানালায় কড়া নাড়তে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাকিস্তান ভুক্তির বিষয়টিও।যে অঞ্চলের সিংহভাগ অধিবাসী ছিল অমুসলিম সেই অঞ্চল কোন ফর্মূলায় পাকিস্তানভুক্ত হল?এমনকি আজও চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাকিস্তান ভুক্তির প্রতিবাদে ১৭ আগষ্ট দিনটি কালো দিবস হিসেবে উদযাপন করে থাকেন।

যাইহোক, আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতি উৎসাহী পাঠক সহ শিক্ষার্থী এবং গবেষকদেরও উপকারে আসবে গ্রন্হটি।এর মুদ্রণ,বাঁধাই সব যথেষ্ট উন্নত মানের।পরিশিষ্টাংশে অবিভক্ত করিমগঞ্জ মহকুমা ও ২০২১ সালের করিমগঞ্জ জেলার দুটি মানচিত্র ছাপা হয়েছে।তবে গ্রন্হটিতে করিমগঞ্জের প্রাচীন স্হাপত্য সহ সংশ্লিষ্ট কিছু ছবি থাকলে আরও ভাল হতো।

করিমগঞ্জ কথা/বাণীব্রত রায়

পরিবেশক-প্যাপিরাস,২ গণেন্দ্র মিত্র লেন

কলকাতা ৭০০০০৪/ মূল্য ৫৯০ টাকা

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.