স্বামী বিবেকানন্দ: অন্তর্নিহিত শক্তির এক স্থাপত্য
অশেষ সেনগুপ্ত
January 12, 2026
যে চিন্তাধারা মানুষকে ভয় নয়, দায়িত্ব নিতে শেখায়—তা কালের সীমা মানে না। এই সময়ে, যখন অনুপ্রেরণা প্রায়ই স্লোগান ও সামাজিক মাধ্যমের থ্রেডে আবদ্ধ, তখন স্বামী বিবেকানন্দকে স্মরণ করা মানে শুধু এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নয়; বরং এমন এক চিন্তাধারার মুখোমুখি হওয়া, যা মানুষের অন্তর্লোককে পুনর্গঠনের আহ্বান জানায়। তাঁর জীবনকথার বহু ঘটনা—ইতিহাস ও স্মৃতির সীমানায় দাঁড়িয়ে—আজও শিক্ষার ভাষায় কথা বলে। এই ঘটনাগুলি তথ্যের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাদের প্রতীকী তাৎপর্যে।
চর্চিত কাহিনিতে বলা হয়, বারাণসীতে পথচলার সময় হঠাৎ একদল বানরের আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন তরুণ নরেন্দ্রনাথ। প্রথম মুহূর্তে স্বাভাবিক ভয় এলেও, অন্তরের এক দৃঢ় নির্দেশে তিনি পালালেন না, বরং স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। ফলাফল ছিল তাৎক্ষণিক: বানরগুলো সরে গেল। ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে যাচাইযোগ্য হোক বা না হোক, এই উপাখ্যানটি বিবেকানন্দের চিন্তার এক মৌল সত্যকে স্পষ্ট করে—জীবনের ভয় ও সংকটকে এড়িয়ে গেলে তারা শক্তিশালী হয়, আর মুখোমুখি দাঁড়ালে অনেক সময় তারাই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ‘মুখোমুখি হও’ মানসিকতাই ছিল তাঁর চরিত্র ও উপদেশের কেন্দ্রে—একটি নৈতিক সাহস।
এই সাহস কোনো আবেগপ্রসূত উচ্ছ্বাস ছিল না; তার ভিত্তি ছিল কঠোর আত্মশাসন। সন্ন্যাসজীবনে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আরাম ও অর্থ থেকে দূরে থাকতেন। অর্থ স্পর্শ না করার ব্রত সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যা ছিল গভীর মনস্তাত্ত্বিক—মানুষের মন এতটাই অস্থির ও প্রলোভনপ্রবণ যে, সামান্য সুযোগ পেলেই তা মানুষকে নিজের দাসে পরিণত করে। সুতরাং আত্মনিয়ন্ত্রণ কোনো ত্যাগের অভিনয় নয়; এটি ছিল আত্মগঠনের এক মৌলিক কৌশল।
শারীরিক কষ্টকেও তিনি সহজ স্বাভাবিকতায় গ্রহণ করতেন। নিজের স্থূলতা নিয়ে হাস্যরস করে তিনি বলেছিলেন—এটি তাঁর ‘দুর্ভিক্ষ-বিমা’। কিন্তু এই রসিকতার আড়ালে ছিল গভীর তপস্যা: দীর্ঘ উপবাস, খালি পায়ে চলা, অনিশ্চিত জীবনযাপন। এসবই তিনি গ্রহণ করেছিলেন চরিত্র গঠনের অনুশীলন হিসেবে। তাঁর কাছে আত্মসংযম ছিল শক্তি সঞ্চয়ের উপায়—আত্মাকে দৃঢ় করার এক নীরব সাধনা।
এই আত্মসংযম ও অন্তর্মুখী সাধনাই একসময় তাঁকে নিয়ে যায় জীবনের এক নির্ণায়ক মুহূর্তের দিকে। আর্থিক অনটন, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এই অবস্থায় তিনি ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত কন্যাকুমারীতে পৌঁছেছিলেন। জীবনীসূত্রে জানা যায়, সেখানে মাতৃ আরাধনায় তিনি গভীর ধ্যানে আত্মনিবেদন করেছিলেন—নিজের জন্য নয়, দেশের মানুষের জন্য। যার নীরব সাক্ষ্য আজও সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা শিলা বহন করে চলেছে।
এই অভিজ্ঞতাকে কেউ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখেন, কেউ প্রতীকি রূপে। কিন্তু তার তাৎপর্য অনস্বীকার্য। ধ্যানশেষে তিনি যে উপলব্ধি নিয়ে ফিরে আসেন, তা ছিল সুস্পষ্ট—দেশের মানুষের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করা, আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া, সংগঠনের মাধ্যমে সমাজকে পুনর্গঠন করা। এই মুহূর্তটিই যেন তাঁকে এক অন্তর্মুখী সন্ন্যাসী থেকে বহির্মুখী সমাজচিন্তকে রূপান্তরিত করেছিল।
বিবেকানন্দের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানবমর্যাদা। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন—প্রত্যেক মানুষই ঐশ্বরিক সম্ভাবনার ধারক। তাঁর মতে, আত্মার কোনো জাত নেই, লিঙ্গ নেই, অসম্পূর্ণতাও নেই। সামাজিক বৈষম্য, ঘৃণা বা অবমাননা—সবই মানুষের প্রকৃত পরিচয়ের বিকৃতি। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বলেছিলেন, অন্যের সেবা মানেই ঈশ্বরের সেবা।
এই ভাবনা কেবল তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না। দরিদ্র, অসুস্থ ও বঞ্চিত মানুষের সেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। ‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা’ তাঁর কাছে কোনো স্লোগান নয়; এটি ছিল মানবসেবার দর্শনকে বাস্তব জীবনে রূপ দেওয়ার পথ।
শিক্ষা সম্পর্কেও তাঁর ভাবনা ছিল যুগান্তকারী। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানে তথ্যের ভার চাপানো নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের ভিতরে থাকা পরিপূর্ণতাকে উন্মোচিত করে। শিক্ষক কোনো নির্মাতা নন—তিনি পথের প্রতিবন্ধক সরিয়ে দেন মাত্র। এই কারণেই তিনি মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে ‘মানুষ-গড়া শিক্ষা’র কথা বলেন—যে শিক্ষা আত্মবিশ্বাস, নৈতিক দৃঢ়তা ও স্বনির্ভরতা গড়ে তোলে। এই শিক্ষাদর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বর্তমানে বিবেকানন্দকে প্রায়ই অতিমানবিক প্রতিমায় রূপান্তর করা হয়। কিন্তু সেই মূর্তির আড়ালে হারিয়ে যায় তাঁর বাস্তববাদী মনন। তিনি অন্ধ বিশ্বাস ও ফাঁপা আচারকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন; আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক চেতনাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এই অর্থে তিনি আধুনিক অগ্রগতি ও মানবিক দর্শনের এক অগ্রদূত।
বিবেকানন্দ তাই কেবল অতীতের একজন সন্ন্যাসী নন; তিনি অন্তর্গত শক্তির এক স্থপতি। আত্মসংযম, সাহস, নৈতিক স্বচ্ছতা ও মানবিক দায়িত্ব, এই উপাদানগুলির সমন্বয়েই তিনি মানুষের পুনর্গঠনের পথ দেখিয়েছিলেন। অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ে তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পালিয়ে যাওয়ায় নয়, গভীর আত্মসমীক্ষা ও সচেতন কর্মেই নিহিত আছে প্রকৃত শক্তি।
সেই কারণেই, সমুদ্রের প্রান্তে একাকী শিলায় বসে ধ্যানরত এক বাঙালি সন্ন্যাসীর কণ্ঠ আজও আমাদের পথ দেখায়—ভিতরের শক্তিকে ভয় নয়, দায়িত্বে রূপান্তর করার, এবং সেই শক্তিকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করার এক নিরবচ্ছিন্ন আহ্বান হয়ে।
আরও পড়ুন...