জন্মভূমির টানে
মোসলেম উদ্দিন আহমেদ
September 16, 2026
জীবনের একটা বড় অধ্যায়-সরকারি চাকরির কর্মজীবন-শেষ করে আজ তথাকথিত কর্মব্যস্ততা থেকে অবসর জীবন। মনে পড়ে কত কথা! ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলো যেন আজও জীবন্ত। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে মাঝে মাঝে অবচেতন মনে হয়, তাড়াতাড়ি তৈরি হতে হবে-অফিসের সময় হয়ে গেছে। আবার মনে পড়ে, জীবনের সেই অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই হাসি পায়।
বন্ধু বা প্রতিবেশীরা দেখা হলে প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন,“চাকরির ব্যস্ত কর্মজীবন শেষে এখন সময় কাটান কীভাবে?” সময় তো চলে যাচ্ছে-সময় তো কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সত্যিই, সময় কীভাবে চলে যায়, তার হিসাব করা বড় কঠিন। সকাল থেকে কখন যে দিনটা শেষ হয়ে যায়, অনেক সময় বুঝতেই পারি না।সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকার অপেক্ষায় থাকি। পত্রিকা পড়া শেষ হলে রেডিওতে অল ইন্ডিয়া রেডিও, বিবিসি ও স্থানীয় সংবাদ শুনি। এরপর টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশ-বিদেশের নানা খবর, আলোচনা ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান দেখা-শোনার মধ্য দিয়েও বেশ কিছুটা সময় কেটে যায়। তার পাশাপাশি উপন্যাস, গল্প ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পড়া, প্রয়োজনে স্থানীয় হাট-বাজারে যাওয়া, পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করে গল্পগুজব করা-এসব তো আছেই।
আমার জন্মভূমি আড়ালিয়া গ্রামে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিই।আবার সোনামুড়া মহকুমার বিভিন্ন প্রান্তে প্রিয়জনের শেষ বিদায়ের মুহূর্তে জানাজা বা শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকি। এই ছোট ছোট কাজ, মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ,আনন্দ-বেদনার নানা মুহূর্তের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখার মধ্যেই কখন যে সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, কখন যে আরেকটি দিন জীবনের খাতা থেকে ঝরে যায়-টেরই পাই না।আসলে, সরকারি নিয়মানুযায়ী কর্মজীবন শেষ হয়েছে, কিন্তু জীবন তো থেমে নেই। সময়ের স্রোতে ভেসে চলাই এখন জীবনের নতুন অধ্যায়।
এরই মধ্যে একদিন মাতৃভূমি আড়ালিয়ায় গেলাম। সারাদিন গ্রামে কাটিয়ে বিকেলে আমাদের ছোটবেলার সেই শহর সোনামুড়ায় কয়েকজন পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। কথায় কথায় ফিরে এল স্কুলজীবনের নানা কথা, ফেলে আসা দিনের কত স্মৃতি।
দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা পাস করে প্রায় ৪২ বছর আগে, ১৯৮৪ সালে,এন.সি.ইনস্টিটিউশন থেকে বেরিয়ে এসেছি। অথচ এত বছর পরেও মনে হলো, স্কুলের সেই দিনগুলো যেন একেবারেই পুরনো হয়নি। ক্লাসরুমের দৃশ্য, প্রিয় সহপাঠীদের মুখ, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্মৃতি-সবকিছুই যেন আজও চোখের সামনে জীবন্ত।
এখন তো প্রযুক্তির যুগ। কথাচ্ছলে এক স্কুলবন্ধুকে বললাম, “চলো, আমাদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ‘Ex Students of NCI,Sonamura’ নামে একটি WhatsApp Group তৈরি করি। সম্ভব হলে একদিন একটি Alumni Association-ও গড়ে তোলা যায়।” বন্ধুটি আমার প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করে বলল, “হ্যাঁ,অবশ্যই। আমাদের সবাইকে নিয়ে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া উচিত।আমাদের স্কুলের গৌরবও তো কম নয়। ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি ত্রিপুরার শতবর্ষ-প্রাচীন বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়টি কয়েকবার স্থান পরিবর্তন করেছে।একসময় স্কুলটি বর্তমান সোনামুড়া দ্বাদশ শ্রেণির বালিকা বিদ্যালয়ের স্থানে ছিল। পরে, সম্ভবত ১৯৬৮–১৯৬৯ সালে, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে, বিদ্যালয়টি মধুবনের একটি টিলাভূমিতে স্থানান্তরিত হয়। দীর্ঘদিন সেখানেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলেছে। সেই মধুবনের নবদ্বীপ চন্দ্র ইনস্টিটিউশনেই আমি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি।”
পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে বিদ্যালয়ের পুরনো স্থানে সোনামুড়া সরকারি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে-যা বর্তমানে কবি নজরুল মহাবিদ্যালয় নামে পরিচিত-স্কুলটি আবার স্থানান্তরিত হয়ে সোনামুড়া মহকুমা শাসকের কার্যালয়ের পাশে বর্তমান স্থানে চলে আসে। এখনও বিদ্যালয়টি সেখানেই রয়েছে। ত্রিপুরার অনেক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা ইতিমধ্যেই পুনর্মিলনীর আয়োজন করছেন। আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিলে আমরাও নিশ্চয়ই তা করতে পারি।”বন্ধুর কথাগুলো শুনে মনে হলো, এ শুধু একটি WhatsApp group তৈরি করার পরিকল্পনা নয়; এর মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোকে আবার একসূত্রে বাঁধার এক নতুন স্বপ্ন।
শুরু হলো সেই যাত্রা। তৈরি হলো ‘Ex Students of NCI, Sonamura’ WhatsApp group। হলো একটি অনলাইন মিটিং। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো-আরও একটি অনলাইন মিটিংয়ের পর একটি ফিজিক্যাল মিটিং করা হবে। শুরু হলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুরনো ছাত্রছাত্রীদের খোঁজ। দেখতে দেখতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বহু প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী এই গ্রুপে যুক্ত হয়ে গেলেন। আমিও শুরু করলাম আমার হারিয়ে যাওয়া পুরনো বন্ধুদের খুঁজে বের করার চেষ্টা। কত বছর পর কারও সঙ্গে আবার যোগাযোগ হলো, কারও খবর পাওয়া গেল দীর্ঘ চার দশক পর!
সময়ের স্রোতে যে বন্ধুরা,যে সম্পর্কগুলো আর যে স্মৃতিগুলো দূরে কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল,তারা যেন একে একে ফিরে আসতে লাগল।মনে হচ্ছিল,আমাদের সেই ছোট্ট স্কুলজীবন-যে জীবনকে আমরা ভেবেছিলাম চিরতরে ফেলে এসেছি-তা যেন আবার ধীরে ধীরে এক জায়গায় ফিরে আসছে। সময়ের দূরত্ব বাড়লেও, স্মৃতির দূরত্ব যে কখনও বাড়ে না।
শ্রী বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য নবদ্বীপ চন্দ্র ইনস্টিটিউশনের একজন প্রাক্তন ছাত্র এবং ত্রিপুরা রাজ্য প্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্ভিস গ্রেড-ওয়ান কর্মকর্তা। অত্যন্ত অভিজ্ঞ এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্কুলজীবন এবং কর্মজীবন-উভয় ক্ষেত্রেই আমার চেয়ে অনেক সিনিয়র। তাঁর পিতা, শ্রদ্ধেয় শ্রী রবীন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য, সোনামুড়া নবদ্বীপ চন্দ্র ইনস্টিটিউশনের প্রখ্যাত ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আমিও তাঁর ছাত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
বিশ্বনাথদা আমাকে দুটি ফোন নম্বর দিয়ে বললেন,“ওরা দুজন আমার খুব প্রিয় সহপাঠী ছিল, সম্ভবত ১৯৬৪ সালের দিকে। পরবর্তীকালে ওরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে চলে যায়। ওদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তুমি ওদের সঙ্গে একবার ফোনে কথা বলে আমাদের স্কুলের গ্রুপে ওদের যুক্ত করে নাও।ওরা নবদ্বীপ চন্দ্র ইনস্টিটিউশনের অ্যালামনিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে খুবই উৎসাহী।”
তিনি আরও জানালেন, তাঁরা অনলাইন মিটিংয়েও যোগ দেবেন।বিশ্বনাথদার কথামতো দেওয়া একটি নম্বরে ফোন করলাম। ফোনটি ধরলেন মোহাম্মদ আলী ইমাম মজুমদার সাহেবের বড় ছেলে। আমি নিজের পরিচয় দিয়ে তাঁর বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। তিনি বিনীতভাবে জানালেন, “বাবা ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক কিছু সমস্যা হয়েছিল। তবে এখন অনেকটাই ভালো আছেন। আজই তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমরা এখন তাঁর চিকিৎসার যাবতীয় খরচ মেটানোর জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দিতে এসেছি। তাই এই মুহূর্তে একটু ব্যস্ত আছি। আপনি যদি কাল বা পরশু ফোন করেন, তাহলে বাবা আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।”
কথাগুলো শুনে আমার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। প্রায় ছয় দশক আগে যাঁরা একই বিদ্যালয়ের একই বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করতেন, জীবনের পথ তাঁদের কত দূরে নিয়ে গেছে! একজন এই পারে, অন্যজন অন্য দেশে। তবুও তাঁদের শিকড় রয়ে গেছে সেই একই বিদ্যালয়ে-নবদ্বীপ চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে।
দেশভাগ হয়েছে, দুই দেশের সীমানায় তৈরি হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া।কিন্তু মনের আঙিনায় আজও কোনো প্রাচীর নেই, কোনো বাধা নেই। সময়, দূরত্ব আর জীবনের নানা ব্যস্ততা তাঁদের আলাদা করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু পুরোনো বিদ্যালয়ের স্মৃতি আজও তাঁদের হৃদয়ে অমলিন। আর সেই স্মৃতির টানেই হয়তো এত বছর পর আবার তাঁরা ফিরে আসতে চাইছেন তাঁদের প্রিয় স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের মিলনমেলায়।
বিশ্বনাথদার দেওয়া দ্বিতীয় নম্বরটিতে ফোন করেও অদ্ভুতভাবে আবার মোহাম্মদ আলী ইমাম মজুমদার সাহেবের কাছেই ফোন চলে গেল। বিষয়টি আমার কাছে একটু অদ্ভুত লাগল। তাই বিশ্বনাথদাকে জানালাম,“আপনি যে দ্বিতীয় নম্বরটি দিয়েছেন,সেটিও তো আলী ইমাম মজুমদার সাহেবের কাছেই চলে যাচ্ছে। নম্বরটি হয়তো ঠিক নেই। আপনি যদি নম্বরটি আবার সংগ্রহ করে আমাকে পাঠান, তাহলে সুবিধা হয়।”
বিশ্বনাথদা কথামতো নম্বরটি আবার সংগ্রহ করে আমাকে পাঠালেন। এরপর একদিন আমি সেই নম্বরে একটি মেসেজ পাঠিয়ে বিনীতভাবে জানতে চাইলাম, “স্যার, আপনার কখন সময় হবে? কোন সময় আপনাকে ফোন করলে আপনার সঙ্গে কথা বলতে সুবিধা হবে, জানালে আমি সেই সময় ফোন করব।” সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল-সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে ফোন করলে তাঁর সঙ্গে কথা বলা যাবে। বুঝতে পারলাম, সকালবেলাটাই তাঁর অবসর সময়।
পরদিন ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টায় WhatsApp-এ তাঁকে ফোন করলাম। সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটি রিসিভ করলেন। আমি বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি কাজী শাহ আলম সাহেবের সঙ্গে কথা বলছি?” ওপাশ থেকে ভেসে এল একটি শান্ত, আন্তরিক কণ্ঠস্বর—“মোসলেম উদ্দিন সাহেব বলছেন?”আমি বললাম,“হ্যাঁ, স্যার। আপনার নম্বরটি আমি বিশ্বনাথদার কাছ থেকে পেয়েছি। বিশ্বনাথদাই আপনার নম্বরটি আমাকে দিয়েছেন।”কথা শুরু হওয়ার আগেই মনে হলো—এ শুধু একজন প্রাক্তন ছাত্রের সঙ্গে ফোনে কথা বলা নয়; এ যেন হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের সঙ্গে আবার নতুন করে পরিচয় হওয়া।
কাজী শাহ আলম সাহেব বললেন,“আমি আমার সেই ছোটবেলার স্কুলের একজন প্রাক্তন ছাত্রের সঙ্গে প্রায় ৬২ বছর পর কথা বলছি। এতে আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে, তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। আমি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বসে আছি, অথচ মনে হচ্ছে আমি আর ঢাকায় নেই-আমার মনটা যেন সোনামুড়ায়, আমার সেই ছোটবেলার শহরে ফিরে গেছে। আমি বুঝতেই পারছি না, কীভাবে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল!”
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,“আমাদের চলন-বলন, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস—সবকিছুই এক। তবুও সেই অভিশপ্ত দেশভাগ আমাদের কত আপন মানুষকে দু-দেশে পর করে দিল! একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই শিকড়—তবুও কাঁটাতারের বেড়া আমাদের আলাদা করে রাখল।” তাঁর কণ্ঠে তখন যেন এক অদ্ভুত আবেগ।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “মনে হচ্ছে, সেই স্কুলের দিনগুলোর কথা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সোনামুড়া শহরের বাজারের পশ্চিম পাশে, পুকুরের উত্তর দিকে আমাদের বাড়ি ছিল। সেখান থেকেই প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। আমার সঙ্গে ছিল বিশ্বনাথ, প্রতিমা, অর্চনা লোধ, শ্রীমতি শিবানী, সাহারান ভূঁইয়া, আলকাস মিয়া, আব্দুল মান্নান, আশীষ বর্ধনসহ আরও অনেকে। সবার কথা এখন আর স্পষ্ট মনে নেই।“তবে আমাদের কয়েকজন শিক্ষকের কথা আজও খুব মনে পড়ে। শ্রী রবীন্দ্র ভট্টাচার্য স্যার ছিলেন ইংরেজির একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত। শ্রীতারাপদ বিশ্বাস ছিলেন বাংলার শিক্ষক, যদিও তিনি বাংলা ছাড়াও অঙ্ক, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয় পড়াতেন। জুলফিকার আলী ছিলেন অঙ্কের শিক্ষক। আর প্রতিভা দিদিমণির কথাও আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। শ্রী কামাখ্যা রায়চৌধুরী স্যার ছিলেন আমাদের শারীরিক শিক্ষক।তাঁদের স্নেহ, শাসন আর পড়ানোর সেই দিনগুলো আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।”
তিনি আবার বললেন,“জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও, যখনই একা থাকি, তখনই মনে হয় যেন আবার সেই স্কুলের মাঠে ফিরে গেছি—চারপাশে আমার সহপাঠীরা, সামনে আমাদের প্রিয় শিক্ষকরা, আর আমি সেই ছোট্ট সোনামুড়ার স্কুলছাত্র।স্কুলের সেই দিনগুলোর কথা আজও মনে পড়ে। স্কুল শুরু হওয়ার আগে প্রতিদিন আমরা ছেলে-মেয়ে সবাই শান্তির প্রতীক অশোক স্তম্ভের সামনে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গাইতাম দেশের জাতীয় সংগীত—“জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে, ভারত ভাগ্যবিধাতা…”। জাতীয় সংগীতের সেই আবহ, সেই সম্মিলিত কণ্ঠস্বর এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার সেই অনুভূতি আমাদের কচি মনে যে দেশপ্রেমের বীজ বপন করেছিল, তা আজও হৃদয়ের গভীরে অমলিন। সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয় এবং এক গভীর দেশপ্রেমের অনুভূতিতে হৃদয় ভরিয়ে তোলে।
”ফোনের ওপাশে বসে থাকা মানুষটির কথায় যেন আমি দেখতে পেলাম বহু দূরের এক পুরোনো সোনামুড়াকে—একটি ছোট্ট শহর,একটি স্কুল, কয়েকজন কিশোর-কিশোরী, আর তাদের অজান্তেই শুরু হয়ে যাওয়া জীবনের দীর্ঘ পথচলা।দেশ বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে, সময় বদলেছে-কিন্তু শৈশবের সেই স্কুলটি আজও তাঁদের হৃদয়ের ঠিকানা হয়ে আছে।
তাঁর কথা শুনতে শুনতে আমারও মনে হচ্ছিল, আমরা যেন আর বর্তমান সময়ে নেই। কয়েক হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব, দুই দেশের সীমান্ত আর জীবনের প্রায় ছয়-সাড়ে ছয় দশকের ব্যবধান-সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেল। ঢাকায় বসে থাকা একজন মানুষ ফিরে গেলেন তাঁর শৈশবের সোনামুড়ায়, আর আমি তাঁর স্মৃতির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বহু বছর আগের সেই স্কুলজীবনের দিনগুলোর কাছে। মনে হলো, সময় মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু শৈশবের স্মৃতি মানুষকে আবার কাছে টেনে আনে। একটি বিদ্যালয় তাই শুধু ইট-পাথরের একটি ভবন নয়; মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক টুকরো শৈশব, এক পৃথিবী স্মৃতি এবং এক অদৃশ্য বন্ধন।
কাজী শাহ আলম সাহেব তাঁর স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আরও বলেন, “আমার ভাই কাজী সিদ্দিকুর রহমান খুব ভালো ফুটবল খেলত। শুধু ফুটবলই নয়, নাটকের প্রতিও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। সে একজন ভালো নাট্যকারও ছিল। বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করার পাশাপাশি নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত থেকে সে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিল। তার সেই প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার কথাও আজও আমার খুব মনে পড়ে।
সোনামুড়ার খেলার মাঠে ওর পায়ে একবার বল গেলে সবাই বলত, ‘এইবার আর গোল না হয়ে রক্ষা নেই!’ সিদ্দিকুর এত ভালো ফুটবল খেলত যে,সোনামুড়া ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন মহকুমার হয়ে সে ফুটবল খেলেছে। শুধু তাই নয়, ত্রিপুরা রাজ্য দলের হয়েও রাজ্যের বাইরে মনিপুর ও নাগাল্যান্ডে গিয়ে ফুটবল খেলেছে। ফুটবলের প্রতি তার দক্ষতা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসার কারণে সে সে সময় বেশ পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।”
সোনামুড়া একসময় ফুটবল খেলার জন্য বেশ বিখ্যাত ছিল। বিশেষ করে বড় কোনো খেলার দিন সোনামুড়ার ফুটবল মাঠ যেন পরিণত হতো এক বিশাল জনসমুদ্রে। শুধু সোনামুড়া শহর নয়, আশপাশের গ্রাম—আড়ালিয়া, খেদাবাড়ি, বরদোয়াল, চন্দনমুড়া, দুর্গাপুর, বেজিমারা, রবীন্দ্রনগর, ধনপুর—এমনকি দূরের গ্রাম থেকেও দলে দলে মানুষ খেলা দেখতে ছুটে আসতেন। খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগেই মাঠের চারপাশে মানুষের ভিড় জমে যেত। দর্শকের ঢল এতটাই বেশি হতো যে মাঠের চারপাশে কোথাও আর ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়া যেত না। সে ছিল এক অন্যরকম সময়। ফুটবল তখন শুধু খেলা ছিল না; ছিল মানুষের আনন্দ, উত্তেজনা আর একসঙ্গে মিলিত হওয়ার এক বড় উপলক্ষ। প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ের সঙ্গে গোটা সোনামুড়ার মানুষের আবেগ যেন একসূত্রে বাঁধা থাকত। সেই ভরা মাঠ, দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর খেলার উত্তেজনা-আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।সেই দিনগুলো কী আনন্দেরই না ছিল!
এরপর কাজী শাহ আলম সাহেব বললেন, “আমাদের নবদ্বীপ চন্দ্র ইনস্টিটিউশন তখন সোনামুড়ার বর্তমান গার্লস স্কুলের জায়গায় ছিল। ক্লাসরুমের সামনে আমাদের একজন শিক্ষক, শ্রী কামাখ্যা রায়চৌধুরী,বিজয় বর্ধন সহ অন্যান্য সম্মানিত স্যারেদের উদ্যোগে শান্তির প্রতীক হিসেবে একটি অশোকস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছিল। সেই দৃশ্যের স্মৃতিও আজও আমার মনে গেঁথে আছে।”
কিছুক্ষণ থেমে তিনি বললেন,“তবে আমার যতদূর মনে পড়ে, এরই মধ্যে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের প্রভাব আমাদের ছোট্ট শহরেও পড়তে শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে আমাদের সেই শান্তিপূর্ণ দিনগুলো বদলে যেতে লাগল। সোনামুড়া শহরে তখন মহরম উপলক্ষে খেলার মাঠে বিরাট একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল। অসংখ্য মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, সেখানে অংশ নিয়েছিলেন। তখনও সোনামুড়ার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য ছিল।”
“কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করল। শুরু হয়েছে ‘এক্সচেঞ্জ’—অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম পরিবারগুলোর এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়া। অনেকেই জমি-বাড়ি বিনিময়ের মাধ্যমে দেশ পরিবর্তন করছিলেন। আমরা জানতাম, এসব অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি অনুমোদন নিয়েই হচ্ছিল।”
এরপর তিনি তাঁদের পরিবারের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করলেন।“এই সময় আমাদের বাড়ির পাশের একটি বাড়িতে নোয়াখালী থেকে একটি পরিবার এসে বসতি স্থাপন করল। কিছুদিন পর তারা আমাদের পাশের জায়গাটি জবরদখল করার চেষ্টা করতে শুরু করল। এ নিয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি হলো।
“আমার বড় ভাই সিদ্দিক তখন সোনামুড়ার ফুটবল মাঠে একটি খেলায় অংশগ্রহণ করছিল। খেলা শেষ হয়ে গেল, কিন্তু সে তখনও বাড়ি ফেরেনি। বাবা চিন্তিত হয়ে শহরের দিকে খোঁজ নিতে বের হলেন। পরে জানতে পারলেন, পুলিশ সিদ্দিককে ধরে থানায় নিয়ে গেছে।
“বাবা থানায় গিয়ে দেখলেন, সিদ্দিককে লকআপে রাখা হয়েছে। তিনি থানার বড়বাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার ছেলেকে কী অপরাধে ধরে আনা হয়েছে?’“অফিসার বললেন, ‘পাশের বাড়ির ভদ্রলোক আপনার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই ওকে আনা হয়েছে।’“বাবা তখন সিদ্দিককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে, তোর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটা কি সত্যি? তুই এমন কাজ করেছিস?’“সিদ্দিক বলল, ‘না বাবা, আমি কেন এটা করব? ওনার ছেলে তো আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে খেলাধুলা করি, একসঙ্গে পড়াশোনা করি। আমি এটা করিনি। যদি আমি করে থাকি, তাহলে আপনি যে শাস্তি দেবেন, আমি মেনে নেব।’”
কাজী সিদ্দিকুর রহমানের মতো একজন প্রখ্যাত ফুটবলার, নাট্যকার এবং সর্বোপরি এত ভদ্র ও শিক্ষিত একজন মানুষকে একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করার ঘটনায় সবাই অবাক হয়ে যায়। গ্রেফতারের খবরটি দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই অসংখ্য মানুষ থানায় এসে হাজির হন এবং দল-মত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই অন্যায় গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানান।এত বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁর জন্য এভাবে থানায় এসে জড়ো হবেন—এটা থানার ওসি-ও হয়তো ভাবতে পারেননি। পরিস্থিতি দেখে তিনি বেশ কিছুটা বিচলিত ও বিব্রত হয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদই যেন প্রমাণ করে দিয়েছিল, কাজী সিদ্দিকুর রহমান শুধু একজন জনপ্রিয় ফুটবলার বা নাট্যকারই ছিলেন না; তিনি ছিলেন সবার প্রিয়, সবার আপনজন।
কাজী শাহ আলম সাহেব বললেন,“তখন থানার অফিসার ইনচার্জ বাবাকে আলাদা করে বললেন, ‘আসলে এটা একটা অজুহাত-আমি সেটা বুঝতে পারছি। যাই হোক, আমি আপনার ছেলেকে ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু ওই ভদ্রলোক আপনাদের এখানে শান্তিতে থাকতে দেবেন না। আপনার আর কোথাও জায়গা আছে?’“বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের দুর্লভনারায়ণে কিছু জায়গা আছে।’“ওসি সাহেব বললেন, ‘আপনি বরং সেখানে চলে যান।’“বাবা অবাক হয়ে বললেন, ‘এটা কী করে হয়? আমি সেখানে চলে গেলে আমার ছেলে-মেয়েরা কীভাবে পড়াশোনা করবে? এখানেই তো আমাদের সবকিছু।’“ওসি সাহেব বললেন, ‘ঠিক আছে, যান। তবে সাবধানে থাকবেন।’”
“বাবা তখন বললেন, ‘কিন্তু এতে আমাদের কী দোষ? আমরা তো এখানে শান্তিতে আছি, কারও সঙ্গে কোনো ঝামেলা করছি না। তাছাড়া এটা আমার বাবার জন্মভূমি। আমার দাদু, অর্থাৎ বাবার বাবা, কাজী আব্দুল মজিদ, ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম মানিক্যের রাজদরবারে একজন কর্মচারী, অর্থাৎ সার্ভেয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। এই জন্মভূমি ছেড়ে আমরা কেন চলে যাব? তাছাড়া ওই দেশে কে কী করেছে, তার জন্য তো আমরা দায়ী নই।’“ওসি সাহেব শুধু বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি সাবধানে থাকবেন। আমরা বিষয়টি দেখছি।’”
কাজী শাহ আলম সাহেব একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম, তাঁর গলা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে। এত বছর পরও সেই স্মৃতিগুলো যেন তাঁর হৃদয়ের কোথাও জীবন্ত হয়ে আছে।তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,“শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হলো। আমরা কুমিল্লার লাকসামে কিছু পরিবারের সঙ্গে জমি বিনিময় করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেলাম।”
একটু থেমে তিনি বললেন,“কিন্তু সেখানেও আমাদের দুর্দশার শেষ হলো না। গিয়ে দেখলাম, আমার বাবা যে জমিগুলো আমাদের সঙ্গে বিনিময় করেছেন বলে কাগজপত্র করেছিলেন, সেই জমিগুলো আগেই স্থানীয় কিছু মানুষের কাছে টাকা নিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা তখন বুঝতে পারলাম, আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। যাঁরা সেই জমিগুলো আগে থেকেই কিনেছিলেন, তাঁরা আমাদের সেখানে থাকতে দিলেন না।
“আমরা তখন এক মহাবিপদের মধ্যে পড়ে গেলাম। একদিকে নিজের জন্মভূমি সোনামুড়া ছেড়ে আসার বেদনা, অন্যদিকে নতুন দেশে গিয়েও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। শেষ পর্যন্ত আমরা এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। মানুষের জীবনে কষ্ট কাকে বলে, আমরা তা স্বচক্ষে দেখেছি এবং নিজের জীবন দিয়ে অনুভব করেছি।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল। আমিও চুপ করে রইলাম। ফোনের ওপাশে তখন শুধু একজন বৃদ্ধ মানুষের কণ্ঠস্বর নয়—আমি যেন শুনছিলাম একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির গল্প, একটি শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার বেদনা এবং এক অস্থির সময়ের জীবন্ত ইতিহাস।
দেশভাগের সেই ক্ষত যে কত গভীর ছিল, তাঁর কথায় তা যেন নতুন করে অনুভব করলাম। কাঁটাতারের বেড়া শুধু একটি ভূখণ্ডকে দুই ভাগ করেনি; অসংখ্য পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুত্ব ও হৃদয়ের সম্পর্ককেও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কত বছর পেরিয়ে গেছে! তবুও মানুষের জীবনের কিছু ঘটনা সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। বরং সময় যত এগিয়ে যায়, কখনো কখনো সেই স্মৃতিগুলো আরও গভীর হয়ে ওঠে। আর সেদিন, ঢাকায় বসে থাকা কাজী শাহ আলম সাহেবের কণ্ঠে আমি যেন শুনতে পাচ্ছিলাম আমার নিজের শহর সোনামুড়ার বহু বছর আগের এক অচেনা অথচ অত্যন্ত পরিচিত সময়ের প্রতিধ্বনি।
কিছুক্ষণ পর তিনি আবার বললেন,“যাই হোক, সে অনেক কথা। দেশভাগের সময় এক দেশ থেকে আরেক দেশে স্থানান্তরের যে কষ্ট, যারা এর শিকার হননি, তারা কোনোদিনই বুঝতে পারবেন না-এ কেমন কষ্ট। এই বেদনা অত্যন্ত গভীর; এ বেদনা সহজে ভোলা যায় না। জন্মভূমির টান যে কত গভীর, তা আমরা সেই সময় উপলব্ধি করেছি। সেই জন্যই তো বলা হয়—
‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।’”
বহু বছর পর,২০১৯ সালে,একবার সোনামুড়ায়—আমার জন্মভূমি, আমার মাতৃভূমিতে—গিয়েছিলাম। সে কী আনন্দ! মনে হয়েছিল, জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিনগুলোর একটি যেন ফিরে পেয়েছি। বাংলাদেশ থেকে শ্রীমন্তপুর চেকপোস্ট পার হয়ে সোনামুড়া শহরে এসে পৌঁছালাম। সেখানে এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। কথায় কথায় তাঁকে আমার বাল্যকালের বন্ধু বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের কথা জিজ্ঞেস করলাম।তিনি জানালেন,“বিশ্বনাথ তো সিভিল সার্ভিসে ছিলেন। এখন আগরতলায় থাকেন।”তাঁর কাছ থেকেই বিশ্বনাথের বর্তমান ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করে বন্ধুর খোঁজে বের হলাম। বহু বছর পর সেই বাল্যবন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হবে—এই ভাবনায় মনের মধ্যে তখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা ও আনন্দ কাজ করছিল।
অনেক খোঁজাখুঁজি করে আমার বন্ধু তথা ক্লাসমেট বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের আগরতলার বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে সেখানে গিয়ে উঠলাম। বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই বিশ্বনাথ নিজেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল। খুব গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,“কী চাই? কেন এসেছেন?”তখন দুর্গাপূজার মরসুম। হয়তো বিশ্বনাথের ধারণা হয়েছিল, আমরা পূজার চাঁদা চাইতে এসেছি। বিশ্বনাথের স্ত্রীও ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
আমি ভালো করে লক্ষ্য করলাম, বিশ্বনাথের মাথার চুল তখনও যেন ছোটবেলার মতোই সামনের দিকে বাঁকানো! আমি বললাম,“আরে ভাই, তুমি আমার দোস্ত বিশ্বনাথ, না?”সে বলল,“হ্যাঁ, বিশ্বনাথ।”“আরে, আমি তোমার ক্লাসমেট-কাজী শাহ আলম।” বিশ্বনাথ যেন মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরল। দুজনের চোখেই জল। কত বছর পর দেখা! বিশ্বনাথ আবেগভরা কণ্ঠে বলল,“ভাই, কী করে চিনব তোমাকে!”বিশ্বনাথের স্ত্রী বলেন,“ভাইকে ঘরে নিয়ে আসো। তুমি তো কাজী শাহ আলম ভাই সম্পর্কে কত কথা বলেছ!”
সেই মুহূর্তে আমাদের দুজনের মনে হয়েছিল, যেন এতগুলো বছর নয়—মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত আগেই আমরা একই স্কুলের মাঠে,একই ক্লাসরুমে,একই সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম।জীবন আমাদের দুজনকে দুই দেশের দুই প্রান্তে নিয়ে গেলেও শৈশবের সেই বন্ধুত্বের স্মৃতিকে মুছে দিতে পারেনি।
এরই মধ্যে সোনামুড়া শহরের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে চলা আমাদের অতি প্রিয় গোমতী নদী দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেছে, তার কোনো হিসাব নেই। কত ঋতু এসেছে-গেছে, কত প্রজন্ম এই নদীর তীরে এসে আবার চলে গেছে। অথচ গোমতী আজও তার আপন গতিতে বয়ে চলেছে—নীরবে, অবিরাম। তার স্রোতের সঙ্গে যেন বয়ে গেছে আমাদের শৈশব, কৈশোর, আনন্দ-বেদনা আর কত না-বলা কথা। সময়ের স্রোতে মানুষ দূরে সরে গেছে, বদলে গেছে অনেক কিছু; কিন্তু গোমতী যেন আজও তার বুকে ধারণ করে রেখেছে আমাদের ফেলে আসা সেই দিনগুলোর স্মৃতি।
কাজী শাহ আলম সাহেব কিছুক্ষণ থামলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন—“আমি আমার ছোটবেলার সেই প্রিয় স্কুল-নবদ্বীপ চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে গিয়ে স্কুলের চৌহদ্দিতে ঢুকেই আমার চোখ আটকে গেল সেই অশোকস্তম্ভের দিকে। অবাক হয়ে দেখলাম, এত বছর পরও অশোকস্তম্ভটি একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো, সে হয়তো আমাকে চিনতে পারেনি; কিন্তু আমি তাকে ঠিকই চিনেছি। এত বছর পরেও সে যেন আমার শৈশবের একমাত্র জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
আমি আমার ছোটবেলার সেই প্রিয় স্কুলের আঙিনায় পা রাখতেই গভীরভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। মুখ দিয়ে যেন কোনো কথা বের হচ্ছিল না। চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠছিল আমার ছোটবেলার সেই দিনগুলো-সেই ক্লাসরুম, সেই স্কুলের মাঠ, আর কত পরিচিত মুখ! কত বন্ধুবান্ধব ছিল তখন; আজ তারা কোথায় হারিয়ে গেছে, তার কোনো ঠিকানা নেই। অনেককে খুঁজেছি, অনেকের খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বনাথ ছাড়া আর কাউকেই খুঁজে পেলাম না। এসব কথা ভাবতে ভাবতে শরীরের সঙ্গে মনটাও যেন অসাড় হয়ে গেল। মনে হলো, এতদিন পর আমি শুধু একটি স্কুলের আঙিনায় ফিরে আসিনি-ফিরে এসেছি আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কাছে।
আমি এগিয়ে গিয়ে অশোকস্তম্ভটি দুহাতে জড়িয়ে ধরলাম। আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না-এক অবুঝ শিশুর মতো শব্দ করে অঝোরে কাঁদতে লাগলাম। এত বছরের জমে থাকা স্মৃতি, জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাওয়ার বেদনা, ছোটবেলার বন্ধুদের কথা, সেই স্কুলের দিনগুলো-সবকিছু যেন একসঙ্গে বুকের মধ্যে আছড়ে পড়ল।
আমার কান্নার শব্দ শুনে টিচার্স রুম থেকে শিক্ষকরা এবং স্কুলের ছাত্রীরা ছুটে এলেন। তাঁরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন,“আরে, কী হলো? আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? এভাবে কাঁদছেন কেন?”তখন আমার সঙ্গে থাকা এক বন্ধু তাঁদের বললেন,“উনি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে এসেছেন। উনি এই স্কুলেরই একজন প্রাক্তন ছাত্র। এই অশোকস্তম্ভটি যখন স্থাপন করা হয়েছিল, তখন আমরা দুজনই এই স্কুলের ছাত্র ছিলাম।” কাজী শাহ আলম সাহেব এরপর স্কুলের ভেতরে ঘুরে ঘুরে তাঁর সেই পুরোনো ক্লাসরুমটি খুঁজে দেখলেন। যে জায়গায় একদিন বসে পড়াশোনা করেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করেছেন, সেই জায়গাটিই এখন কত অপরিচিত!
পুরোনো সেই টিনের ঘরটি আর নেই। সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে, অনেক কিছু বদলে গেছে। মানুষ চলে গেছে, ঘরবাড়ি বদলে গেছে, প্রজন্ম বদলে গেছে।শুধু সেই অশোকস্তম্ভটি আজও দাঁড়িয়ে আছে—নীরবে, নিশ্চুপে, অতীতের সাক্ষী হয়ে।
তার দিকে তাকালে মনে হয়, সেই ছোটবেলার স্কুলের দিনগুলো, সহপাঠীদের মুখ, শৈশবের কত হাসি-কান্না—সবকিছু যেন তার বুকের মধ্যে কোথাও জমা হয়ে আছে।সেদিন অশোকস্তম্ভটিকে জড়িয়ে ধরে কাজী শাহ আলম সাহেবের কান্না যেন শুধু একজন মানুষের কান্না ছিল না-সেটি ছিল হারিয়ে যাওয়া শৈশবের জন্য কান্না, জন্মভূমির জন্য কান্না, প্রিয় স্কুলের জন্য কান্না এবং ফেলে আসা সেই স্বর্ণালি দিনগুলোর জন্য কান্না। হয়তো সেই অশোকস্তম্ভটি আজও দাঁড়িয়ে আছে-সময়ের কত ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে, কত প্রজন্মের আসা-যাওয়ার নীরব সাক্ষী হয়ে। সে কাউকে কিছু বলে না; শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু আমার কাছে সে আর শুধু একটি অশোকস্তম্ভ নয়-
সে আমার শৈশব,
সে আমার স্কুল,
সে আমার বন্ধুত্ব,
সে আমার জন্মভূমি সোনামুড়া,
সে আমার মাতৃভূমি।
মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর পংক্তি—
“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে,
সার্থক জনম, মাগো, তোমায় ভালোবেসে।”
আর তাই, এত বছর পরেও যখন চোখ বন্ধ করি, মনে হয়—সেই অশোকস্তম্ভটির সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি; আর তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে আমার হারিয়ে যাওয়া সেই ছোট্টবেলা।
সময় তার নিজস্ব গতিতে চলে যায়, মানুষ দূরে সরে যায়, অনেক কিছুই হারিয়ে যায়-কিন্তু মাতৃভূমির টান কখনো হারিয়ে যায় না।
আরও পড়ুন...