দুই টাকার পেন
বিতান কারক, অষ্টম শ্রেণি
October 4, 2026
অভিজিৎ মিত্র পেশায় একজন সফল ব্যবসায়ী । তাঁর একটি বড় ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রী তৈরির কারখানা ছিল । বহু বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি তাঁর ব্যবসাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন । তাঁর তৈরি ওষুধের চাহিদাও ছিল প্রচুর । ব্যবসার কাজে তিনি এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে, ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছুই তিনি প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন ।
শহর থেকে প্রায় দুইশো কিলোমিটার দূরে ছিল তাঁর প্রধান কারখানা । তাই প্রতিদিন সকালে গাড়ি নিয়ে তাঁকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো । একদিন প্রতিদিনের মতোই তিনি কারখানার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন । গাড়ি একটি ব্যস্ত সিগন্যালে দাঁড়াতেই হঠাৎ একটি ছোট মেয়ে গাড়ির কাছে এসে দাঁড়াল। তার পরনে ছিল পুরোনো জামাকাপড় এবং হাতে কয়েকটি সাধারণ পেন ।
মেয়েটি জানালার কাছে এসে বলল,“স্যার, একটা পেন নেবেন? মাত্র দুই টাকা ।”অভিজিৎ মিত্র পেন খুব ভালোবাসতেন । তাঁর সংগ্রহে ছিল দেশ-বিদেশের হাজার হাজার দামী পেন । কোনো কোনো পেনের দাম কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত ছিল। তাই দুই টাকার সাধারণ পেনটি তাঁর কাছে কোনোভাবেই প্রয়োজনীয় ছিল না ।
কিন্তু মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর মায়া হলো । তিনি পকেট থেকে দুই টাকা বের করে একটি পেন কিনে নিলেন।মেয়েটি টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার আগে শুধু বলেছিল, “স্যার, পেনটা যত্ন করে রাখবেন।”অভিজিৎ কথাটার বিশেষ কোনো অর্থ বুঝতে পারেননি ।
কিছুক্ষণ পর তিনি কারখানায় পৌঁছালেন । সেখানে পৌঁছেই তিনি জানতে পারলেন এক বিরাট সুখবর । বিদেশের একটি বিখ্যাত চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠান তাঁর কোম্পানির তৈরি একটি নতুন ওষুধ পছন্দ করেছে এবং তাঁর সঙ্গে কয়েকশো কোটি টাকার ব্যবসায়িক চুক্তি করতে চায় ।
অভিজিৎ মিত্রের বহু বছরের পরিশ্রম যেন আজ সফল হতে চলেছিল । কিছুক্ষণ পর বিদেশি প্রতিনিধিরা তাঁর সামনে চুক্তির কাগজ নিয়ে এলেন । অভিজিৎ তাঁর টেবিলে রাখা দামী পেনটির দিকে হাত বাড়ালেন । তারপর হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল সেই দুই টাকার পেনটির দিকে । তিনি থেমে গেলেন।কেন জানি না, সিগন্যালে দেখা সেই ছোট মেয়েটির কথাটা তাঁর মনে পড়ে গেল ।“স্যার, পেনটা যত্ন করে রাখবেন ।”
তিনি দামী পেনটি সরিয়ে রেখে সেই দুই টাকার পেনটি হাতে নিলেন ।
ঠিক তখনই তাঁর মাথায় হঠাৎ সেই ছোট মেয়েটির মুখ ভেসে উঠল । মেয়েটি গাড়ি ছাড়ার সময় যেন তাঁকে একটি কথা বলছিল—"স্যার, সাবধানে থাকবেন , আপনার সাথে প্রতারণা করা হবে” । অভিজিৎ এর হাত থেমে গেল।তিনি আবার চুক্তির কাগজটি পড়তে শুরু করলেন । এবার খুব মনোযোগ দিয়ে ।
প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা ছিল সাধারণ ব্যবসায়িক শর্তে ভরা । কিন্তু শেষের দিকে একটি শর্ত তাঁর চোখে পড়ল ।
চুক্তিতে এমন একটি ধারা ছিল, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর কোম্পানির পরিচালনার অধিকার ধীরে ধীরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যেতে পারত । অভিজিৎ মিত্রের বুক কেঁপে উঠল ।“এটা কী?”বিদেশি প্রতিনিধিদের একজন শান্তভাবে বলল, " মিস্টার মিত্র এটি শুধু চুক্তির কাগজ মাত্র,আপনি নিঃসন্দেহে সই করুন" । কিন্তু অভিজিৎ এবার আর বিশ্বাস করলেন না ।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করা বন্ধ করে দিলেন ।
সেদিন রাতে তিনি তাঁর আইনজীবীকে পুরো চুক্তিটি পরীক্ষা করতে বললেন । একই সঙ্গে কোম্পানির হিসাব ও গুরুত্বপূর্ণ পেপার গুলি গোপনে পরীক্ষা করার নির্দেশ দিলেন।কয়েক দিনের তদন্তে যে সত্য বেরিয়ে এল, তা অভিজিৎ কে স্তব্ধ করে দিল ।
এই পুরো চুক্তিটা কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক প্রস্তাব ছিল না । এটা ছিল তাঁর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ দখলের পরিকল্পনা।আর এই পরিকল্পনার পেছনে ছিল তাঁর নিজের কোম্পানিরই একজন ঘনিষ্ঠ মানুষ, তার ম্যানেজার যাকে তিনি বহু বছর ধরে বিশ্বাস করে এসেছিলেন ।
লোকটি অভিজিৎ এর সাফল্যে হিংসা বোধ করতো । বছরের পর বছর মিত্র বাবুর পাশে থেকে সে তাঁর ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কোম্পানির আর্থিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে গোপনে পৌঁছে দিচ্ছিল।পরিকল্পনাটা ছিল খুব সহজ । বিদেশিরা অভিজিৎকে বিশাল অঙ্কের টাকার চুক্তির প্রলোভন দেখাবে। অভিজিৎ যদি কাগজে সই করেন, তাহলে চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী ধীরে ধীরে কোম্পানির পরিচালনার ক্ষমতা তাদের হাতে চলে যাবে । অভিজিৎ টাকা পাবেন ঠিকই,কিন্তু নিজের কোম্পানির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ হারাবেন। অভিজিৎ খবরটি শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন । পুরো কারখানায় নিস্তব্ধতা,
তারপর তাঁর চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা সেই দুই টাকার পেনটির দিকে । তিনি ধীরে ধীরে পেনটি হাতে তুলে নিলেন।“যদি ওই মেয়েটি সেদিন পেনটা না বিক্রি না করত”
তিনি বাকিটা আর বলতে পারলেন না । পরের দিন তিনি সেই সিগন্যালে আবার গাড়ি থামালেন । কিন্তু মেয়েটি আর সেখানে ছিল না ।
তিনি অনেক খোঁজ করলেন । আশপাশের দোকানদারদের জিজ্ঞাসা করলেন । কেউ জানত না মেয়েটি কোথায় থাকে । কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারল না সে প্রতিদিন সেখানে আসে কি না । মেয়েটি যেন হঠাৎ এসেছিল
আর নিজের কাজ শেষ করেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল । অভিজিৎ তাঁর অফিসে ফিরে এলেন ।
হাজার হাজার দামী পেনের মধ্যে তিনি সেই দুই টাকার পেনটিকে আলাদা করে রাখলেন।
তারপর নিজের ডায়েরিতে লিখলেন—“আজ আমি কয়েকশো কোটি টাকা হারাইনি । আজ আমি আমার বাবার তৈরি কোম্পানি হারানো থেকে বেঁচে গেলাম ।”
কিন্তু গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়টি ছিল অন্য কিছু , অভিজিৎ কখনও জানতে পারেননি সেই ছোট মেয়েটি কে ছিল।সে কীভাবে জানত বিদেশিদের পরিকল্পনার কথা?
কে তাকে পাঠিয়েছিল ?
সে কি শুধু একজন সাধারণ পেন বিক্রেতা ছিল ?
নাকি কেউ ইচ্ছা করেই তাকে অভিজিৎ মিত্রের সামনে পাঠিয়েছিল ?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর কোনোদিন পাওয়া যায়নি ।
শুধু সেই দুই টাকার পেনটি অভিজিৎ এর কাছে রয়ে গেল ।
আরও পড়ুন...