যাত্রার স্বর্ণালী দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে উত্তরে বিশেষ উদ্যোগ

।।সমর চক্রবর্তী।।

October 8, 2026   

যাত্রার স্বর্ণালী দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে উত্তরে বিশেষ উদ্যোগ
বলা হয়- ভাদ্র মাসেই নাকি শীতের জন্ম। সেইদিক থেকে বলা যায়-

শরৎকাল থেকেই শীতের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়।একটু একটু করে ঘাসের ডগায় বা ধানের শীষে শিশির বিন্দুর স্হান করে নেয়া শুরু হয়। আর হালকা শীতের সাথে পুজো পার্বণ ও বড় উৎসবের সাথে যাত্রাপালার  সত্যিই এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। শীতের উৎসবের সাথে যাত্রাপালার এক মধুর রসায়ন কাজ করে থাকে। মূলতঃ শরৎকাল থেকেই রাতের আবহাওয়া থাকে ঠান্ডা ও মনোরম। খোলা আকাশের নীচে সামিয়ানা খাটিয়ে সারা রাত জেগে যাত্রাগান দেখার জন্য এই সময়টাই সবচেয়ে আরামদায়ক।

বাংলা সংস্কৃতিতে শরৎকালের উৎসব মানেই সর্বত্র আনন্দের ছড়াছড়ি। আর এই উৎসবের পাশে সবচেয়ে বড় পাওনা হল- যাত্রাপালা।বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলে মূলতঃ শরৎকালের উৎসবের মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় যাত্রাপালার ধুম।ঢাকের বাদ্যি আর যাত্রার সেই চেনা সুর সকলের মনে দোলা দিয়ে যায়।

ত্রিপুরায় যাত্রাপালার ইতিহাস অতি প্রাচীন। রাজ্যন্য আমল থেকে  আধুনিকাল পর্যন্ত এর একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে।ত্রিপুরায় যাত্রাপালা পরিবেশন ও লোক নাট্যের বিকাশ মূলতঃ রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা ও পূর্ব বঙ্গের ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক নৈকট্যের কারণে তরান্বিত হয়েছিল।

যাত্রার স্বর্ণালী দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে উত্তরে বিশেষ উদ্যোগ ত্রিপুরায় প্রথম যাত্রাপালার সূচনা হয়- অষ্টাদশ শতকের শুরুতে। ত্রিপুরার তৎকালীন রাজধানী উদয়পুরে মহারাজা রত্নমানিক্যের (দ্বিতীয়) পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম"কালীয় দমন" নামে যাত্রাপালা অভিনীত হয়।বলা হয়- এটিই ত্রিপুরার যাত্রাপালার প্রাচীনতম ঐতিহাসিক প্রামাণ্য। মহারাজা বীর চন্দ্র মানিক্যের আমলে  ( ১৮৬২-১৮৯৬) খ্রীষ্টাব্দে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ত্রিপুরায় যাত্রাপালা শুরু হয় পূর্ণোদ্যমে। অবিভক্ত বাংলার ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর থেকে অসংখ্য পেশাদার ও শৌখিন যাত্রাদল ত্রিপুরায় এসে নিয়মিত পালা করত।

যাত্রার স্বর্ণালী দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে উত্তরে বিশেষ উদ্যোগ জানা যায়- ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরার বিশাল গড় মহকুমার ঈশান চন্দ্র নগরে বিশ্বম্ভর নাথ নামে এক ব্যাক্তি "শৌখীন" নামে একটি অপেশাদার যাত্রা দল গড়ে তোলেন।বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ত্রিপুরার  বিভিন্ন  মহকুমা ও গ্রামাঞ্চলে ছোটবড় অসংখ্য যাত্রাদল গড়ে ওঠে।আগরতলার কাঁসাড়িপট্টি এবং আচার্য্য পাড়ার স্থানীয় দলগুলো ত্রিপুরায় সফলভাবে যাত্রাপালা পরিবেশন করেন।

বর্তমানে আধুনিক বিনোদনের দাপটে যাত্রাপালার সেই স্বর্ণালী দিনগুলো কিছুটা ম্লান হলেও গ্রাম ত্রিপুরায় বিশেষতঃ উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগর মহকুমায় এর আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। লোক শিক্ষার এই ঐতিহ্যমন্ডিত সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ধর্মনগরের কতিপয় যাত্রা শিল্পী নানান প্রতিকূলতাকে  পেছনে ফেলে এখনো এই যাত্রা শিল্পটিকে বছরভর গ্রাম ত্রিপুরার মানুষের কাছে জনপ্রিয় লোক শিক্ষার  বিনোদন শিল্প হিসেবে ধরে রেখেছেন।

সামনেই আর কদিন পরেই বাঙালীর প্রাণের উৎসব- দুর্গা পুজার কাউন্ট- ডাউন শুরু হতে যাচ্ছে।আর এই পূজোকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ধর্মনগরের বীণাপাণি নাট্য কোম্পানী একের পর এক বায়না নিয়ে ব্যস্ত এখন চূড়ান্ত মহড়ায়। ধর্মনগরের রানীবাড়ি চা- বাগানে তিন রাত্রি,এরপরে উদয়পুর, আসামের ঝাটিংঙ্গা থেকে ত্রিপুরার বিভিন্ন  অঞ্চলে একেবারে কালীপুজো অবধি তাদের বুকিং নেয়া হয়ে গেছে। এছাড়াও ধর্মনগরের রাজবাড়ি এবং তিলথৈ অঞ্চলের যাত্রা দলের পক্ষ থেকেও রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসবের মরশুমে যাত্রাপালার বায়না হয়ে গেছে।

যাত্রার স্বর্ণালী দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে উত্তরে বিশেষ উদ্যোগ ধর্মনগরের প্রখ্যাত  যাত্রা ও নাট্য শিল্পী সমন্বয়ে গঠিত বীণাপাণি নাট্য কোম্পানী এবছর তারা তিনটি পালা নিয়ে ময়দানে নেমেছে।মা- মাটি মানুষ,নাচমহল ও তাদের অত্যন্ত জনপ্রিয় পালা- গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম।প্রায় ৩০-৩৫ জনের গোটা দলের এখন চূড়ান্ত মহড়া চলেছে। আজ (৭ অক্টোবর) তাদের মহড়া ঘরে অনেকটা সময় কাটিয়ে এলাম। একঝাঁক দক্ষ ও জনপ্রিয় শিল্পীদের সমন্বয়ে গঠিত এই নাট্য কোম্পানীতে বিশেষ বিশেষ অভিনেতারা রয়েছেন- এরা এই মুহূর্তে এ রাজ্যের সেরা যাত্রা শিল্পী বলা যায়। এই দলটিতে রয়েছে সুমিত নাথ চৌধুরী, সুব্রত দাস, বর্ণালী দাস, তাপস নাথ, মৃন্ময় নাথ, দেবতোষ নাথ সহ আরো অনেক বিশিষ্ট যাত্রাশিল্পীগণ।

যাত্রার স্বর্ণালী দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে উত্তরে বিশেষ উদ্যোগ কোন একটা সময় ছিল যখন এই ধর্মনগরের মঞ্চ কাঁপিয়ে যাত্রাভিনয় করে গেছেন- ভীষ্ম গুপ্ত, কমল গুপ্ত ,দেবব্রত চৌধুরী, সুব্রত ভট্টাচার্য, অজয় চক্রবর্তী, সুনীল দাস, বিভূতি বিশ্বাস, বিজন চন্দ, বিশ্ববন্ধু সেন, সমর সিংহ, অতুল ত্রিবেদী, বিশ্বজিৎ রায়, অঞ্জলী দে, প্রভা দাস প্রমুখ। এদের পরের স্থানটিতে এখন দাপিয়ে এবং চুটিয়ে যাত্রা ও নাট্যাভিনয় করে চলেছে এবং এই শিল্পটিকে এখনো এই অঞ্চলে যথেষ্ট জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় করে রেখেছে যারা তারা হলেন সুমিত নাথ চৌধুরী, সুব্রত দাস, প্রদ্যুন্ম মল্লিক (সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন) বিরাজ পুরকায়স্থ, অভিজিৎ চক্রবর্তী, মিলন দেব, বর্ণালী দাস, কবিতা দত্ত, শুভাশিষ গুপ্ত, মীরা হাম্বীর, প্রভাস দেবনাথ, বৈশালী রায়, তাপস নাথ, মৃন্ময় নাথ সহ আরো অনেকে।

বিবেকের ভূমিকায় বর্তমানে দেবতোষ নাথ, পিন্টু শর্মারা নৃপেন দে, শ্যামল চৌধুরীর জায়গাটা ধরে রেখেছেন।

যাত্রায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যে কনসার্ট বা বাদ্যযন্ত্রের যে বিষয়টি রয়েছে, সেখানে রয়েছে দুলু খান, মতিন্দ্র শব্দকর, নকুল ঋষিদাস, ভানু মিঞা, ইন্দ্রজিৎ সিনহা, প্রতাপ নাথ ও সত্য দাস।

টিভি,ইন্টারনেট বা সোস্যাল মিডিয়ার দাপটে যাত্রাপালার আগের সেই জৌলুস কিছুটা কমলেও উত্তর ত্রিপুরার মানুষের কাছে লোক শিক্ষার এই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম- যাত্রাপালার আবেদন একেবারেই ফুরিয়ে যায়নি। বরং দিন দিনই এই উত্তর জেলায় বিশেষতঃ ধর্মনগর মহকুমায় যাত্রার জয়গান এখনো সমানতালে বেড়েই চলেছে। অন্ততঃধর্মনগরের  বীণাপাণি নাট্য কোম্পানী এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর  হতে দেখা গেল।

   

(Tripurainfo)

more articles...