সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী কম পড়াশুনার চাকরিতে এখন থেকে বেশী পড়াশুনার প্রার্থীরা অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন

জয়ন্ত দেবনাথ

June 8, 2026   

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী কম পড়াশুনার চাকরিতে এখন থেকে বেশী পড়াশুনার প্রার্থীরা অযোগ্য বিবেচিত হতে পারেন

সাবধান। বেশী পড়াশোনা করতে যাবেন না যাতে করে পড়ে চাকরি পেতে অসুবিধা হয়। সেটা নিয়েই পড়াশোনা করুন যাতে করে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি না পেলেও নিজে নিজে কিছু একটা কাজ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
শুনতে অবাক লাগলেও ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক ঐতিহাসিক রায় আমাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। গত ৬ জুন রাজধানীর আয়ুষ গ্রামে রোটারি ক্লাব অব আগরতলার এক অনুষ্ঠানে “একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ ও স্কিল-বেসড লার্নিং কেন প্রয়োজন” বিষয়ক আলোচনায় এই রায়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলাম। ওই অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের যুবক যুবতীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, অনেক বেকার যুবক-যুবতীই এখনও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তাই বিষয়টি বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার লক্ষ্যে এখানে প্রসঙ্গটি ফের অবতারণা করছি।
আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, যত বেশি পড়াশোনা, তত বেশি চাকরির সুযোগ। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আজ ভিন্ন। দেশে লক্ষ লক্ষ উচ্চ শিক্ষিত যুবক যবতী চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হলেও অতিরিক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা প্রার্থীরাও আবেদন করেছেন। আমাদের ত্রিপুরাতেও এমনটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পুলিশের স্পেশাল এক্সিকিউটিভ অফিসার পোষ্টের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে  মাধ্যমিক বা দশম শ্রেণি পাশ। কিন্ত দেখা যাচ্ছে ৬৩৬৭ শূন্যপদের জন্য এখন পর্যন্ত যে পযতাল্লিশ হাজার প্রাথী আবেদন করেছেন তার আর্ধেক প্রার্থীই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ আদেশ পালন করলে অতিরিক্ত ডিগ্রীধারী প্রার্থীরা কিন্ত সেই পদের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়বেন।
কেননা,  সুপ্রিম কোর্ট এক মামলায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, কোনও নির্দিষ্ট পদের জন্য সরকার বা নিয়োগকারী সংস্থা যদি শিক্ষাগত যোগ্যতার সর্বোচ্চ সীমা আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেন, তাহলে সেই সীমার উপরে যোগ্যতা থাকা প্রার্থীকেও বৈধভাবে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে। সুপ্রিম আদালত মনে করেছে, সমাজের অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ প্রাপ্ত মানুষের জন্য কিছু কর্মসংস্থান সংরক্ষণ করা সরকারের একটি ন্যায় সঙ্গত নীতি হওয়া প্রয়োজন। তাই সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। আদালত আসলে বলতে চেয়েছে, সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে নিয়োগ করাই অধিক জরুরী। সব সময় সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিই যে সবচেয়ে উপযুক্ত হবেন, তা নয়। বরং যে প্রার্থীর যোগ্যতা ও দক্ষতা সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তিনিই সেই কাজের জন্য উপযুক্ত।
বর্তমান বিশ্বে শুধু ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবমুখী দক্ষতা। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল পরিষেবা, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, মেরামত প্রযুক্তি, কৃষি-উদ্যোক্তা, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, অনলাইন ব্যবসা, গ্রাফিক ডিজাইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণসহ বহু ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া। তাই শুধু চাকরি প্রার্থী নয়, দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর-র শ্লোগান অনুযায়ী চাকরি সৃষ্টিকারী হওয়ার মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে।
তাই দেখা যাচ্ছে দেশের নতুন শিক্ষা নীতি ২০২০ অনুযাযী সি বি এস সি ২০২৬‐২০২৭ শিক্ষা বর্ষ থেকে যে সিলেবাস চালু করেছেন তাতে নূন্যতম তিনটি ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অর্থাত, নতুন শিক্ষা নীতি অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা, যা মানুষকে আত্মনির্ভর করে তুলবে।
তাই, ত্রিপুরার তরুণদের কাছে আমারও আবেদন, পড়াশোনা অবশ্যই করুন, কিন্তু এমন শিক্ষা গ্রহণ করুন যার সঙ্গে কর্মদক্ষতার সংযোগ রয়েছে। এমন কিছু শিখুন যা আপনাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। সরকারি চাকরি একটি সম্ভাবনা, কিন্ত নিশ্চিত সম্ভাবনা নয়। তাই একবিংশ শতাব্দীর বেকারদের প্রত্যেককেই আত্মনির্ভরতার দিকে লক্ষ্য রেখেই বিকল্প ভাবতে হবে। এটা অনস্বীকার্য যে, দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে কর্মসংস্থানের পথ নিজেই তৈরি করা যায়।
তাই আবারও বলছি, সুপ্রিম কোর্টের গত ৫ জুনের রায় আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে, ডিগ্রি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের সফল সমাজ গড়ে উঠবে সেইসব তরুণদের হাত ধরে, যারা শুধু শিক্ষিত নয়, দক্ষ, কর্মক্ষম এবং আত্মনির্ভর।
(লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)
   (Tripurainfo)

more articles...